জাতীয় সংবাদ

নৌপথের বেহাল দশা

ড্রেজিংয়ের নামে শুভঙ্করের ফাঁকি

জিলানী মিলটন : অপরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের কারণে নৌপথের এখন বেহাল দশা। পদ্মা-মেঘনা থেকে শুরু করে পলি জমার কারণে দেশের অন্যতম যাতায়াতের মাধ্যম নদীপথগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

এ দিকে নৌপথ সচল রাখতে নানা পরিকল্পনা আর বছরে শত শত কোটি টাকা খরচ করা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ড্রেজিংয়ের নামে চলছে শুভঙ্করের ফাঁকি। শুধু নৌপরিবহনের এই খাতেই বছরে ব্যয় করা হচ্ছে শত শত কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, নৌপথ সচল রাখতে শুধু ড্রেজিংয়ের জন্য গত এক বছরে রাজস্ব ও উন্নয়ন খাত থেকে ব্যয় হয়েছে ৮০৩ কোটি টাকা। এই বিপুল টাকা খরচ করে ৪৮২ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং করা হয়েছে বলে কাগজ-কলমে বলা হচ্ছে। তবে বাস্তবে এর এক-তৃতীয়াংশও ড্রেজিং করা হয়নি বলে দাবি করেছেন লঞ্চ মালিক সমিতির নেতারা। অভিযোগ রয়েছে ড্রেজিংয়ের এই বিপুল বাজেটের অধিকাংশই লুটপাট হচ্ছে।

বিআইডব্লিউটিএ ড্রেজিং বিভাগের তথ্য মতে, নৌপথের নাব্যতা রক্ষায় ২০২০ সালে এক বছরে ৮০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৮২ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং করা হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে শিমুলিয়া-কাঁঠালিয়া, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া, পাটুরিয়া-বাঘাবাড়ি, ভোলা-লক্ষ্মীপুর, পটুয়াখালীর কারখানা-বগা-ঝিলনা-পটুয়াখালী নদীবন্দর (লোহালিয়া/লাউকাঠি) এলাকা, পটুয়াখালী-গলাচিপা-খেপুপাড়া, বরিশাল বন্দর এলাকা, হরিণা-আলুবাজার ফেরিরুট, বালাশী ও বাহাদুরাবাদ নৌপথ, দিলারপুর-নিকলী-নেত্রকোনা-চামড়াঘাট, ছাতক-ভোলাগঞ্জ, মোহনগঞ্জ-নালিতাবাড়ি, দাউদকান্দি-হোমনা-রামকৃষ্ণপুর, মাদারীপুর-টরকী-হোসনাবাদ-ফাসিয়াতলা, হজরতপুর-জাবরা, সুনামগঞ্জ-ডুলুরা, চিত্রা-নবীনগর-গোকর্নঘাট-কুনিবাড়ি, পুরাতন ব্রহ্মহ্মপুত্র নদ।

কিন্তু বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। নদীর বিভিন্ন চ্যানেলে পলি জমে চর জেগেছে। আবার কোথাও ডুবোচর । ফলে এই শুকনো মৌসুমে প্রতিদিন নৌপথে চলাচলকারী যানবাহনগুলোকে সিমাহীন দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বরিশাল নৌবন্দর সংলগ্ন কীর্তনখোলা নদীতে পলি জমে নাব্যতা সঙ্কটের সৃষ্টি হওয়ায় ভোগান্তি বেড়েছে লঞ্চ চলাচলে। ঢাকা-বরিশাল নৌরুটের এমভি সুন্দরবন-১১ লঞ্চের মাস্টার আলমগীর হোসেন বলেন, ঢাকা-বরিশাল নৌরুটে বরিশাল নদীবন্দর থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত কমপক্ষে ছয়টি পয়েন্ট নাব্যতা সঙ্কটের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এসব পয়েন্ট হয়ে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল করতে গিয়ে কখনো কখনো দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। তিনি জানান, নাব্যতা সঙ্কটের কারণে ইতোমধ্যে মিয়ারচর চ্যানেলটি বন্ধ হয়ে গেছে। গত এক বছর ধরে ওই চ্যানেল হয়ে লঞ্চ চলাচল করতে পারছে না। চ্যানেলটির বিভিন্ন পয়েন্টে পলিমাটি জমে নদীর গভীরতা কমে গেছে। এ কারণে বিকল্প চ্যানেল মেঘনার উলানীয়া-কালিগঞ্জ হয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে দক্ষিণাঞ্চলের সব লঞ্চের গন্তব্যে পৌঁছতে ২ ঘণ্টা সময় বেশি লাগছে। এতে কমপক্ষে তিন ব্যারেল (৬০০লিটার) জ্বালানি তেল বেশি লাগে। বর্তমানে বিকল্প ওই চ্যানেলটিও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

একই অবস্থা বরিশাল শহরের উপকণ্ঠ শায়েস্তাবাদের কীর্তনখোলা ও আড়িয়াল খাঁসহ তিন নদীর মোহনায়। সেখানে পলিমাটি জমে চ্যানেলটি বন্ধ হওয়ার পথে। তিন নদীর ওই মোহনায় ভাটার সময় চলাচল করতে গিয়ে প্রায়ই নৌযানগুলো আটকে যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাওয়া-শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া-আরিচা, পাটুরিয়া-বাঘাবাড়িসহ দেশের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটে সারা বছর ড্রেজিং করা হলেও নাব্যতা সঙ্কটের কারণে প্রায়ই ফেরি ও নৌচলাচল বন্ধ থাকে। এক সময় সারা দেশের সাথে রাজধানী ঢাকার সহজ যোগাযোগের মাধ্যম ছিল নৌপথ। কিন্তু অপরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের কারণে নাব্যতা সঙ্কট দেখা দিচ্ছে। এ কারণে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সহজ ও নিরাপদ নৌরুটগুলো। চ্যানেলের বিভিন্ন পয়েন্টে ডুবোচরে পণ্যবাহী জাহাজ আটকে থাকায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ব্যাপারে লঞ্চ মালিক সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি সহিদুল ইসলাম ভূইয়া বলেন, আমাদের দেশের নৌপথগুলো সঠিক ড্রেজিংয়ের অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছর ড্রেজিংয়ের নামে টাকা চুরি বা লুটপাট করা হচ্ছে। ড্রেজিং বিভাগ নদীর মাটি বা পলি নয়, পানি কাটে। তার দাবি ২০২০ সালে যে ৮০৩ কোটি টাকার ড্রেজিং করা হয়েছে বলা হচ্ছে বাস্তবে তা ঠিক নয়। তিনি বলেন, বাস্তবে সংস্থাটির ড্রেজিং বিভাগ এ খাতে গত বছর ২০০ কোটি টাকার বেশি খরচ করেনি। বাকি টাকা গেছে অসাধু কর্মকর্তাদের পকেটে।

তিনি দাবি করেন ড্রেজিংয়ের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও বলগেটে বা বৈধ-অবৈধ বালু উত্তোলনকারী মেশিনের মাধ্যমে বালু বা পলিমাটি উত্তোলন না হলে এত দিনে বন্ধ হয়ে যেত সারা দেশের নৌচলাচল। তিনি বলেন, ড্রেজিংয়ের নামে শত শত কোটি কোটি টাকা লোপাটের জন্য বালু নদীতে ফেলা হয়। এর ফলে আবার পাশেই চর পড়ে। ড্রেজিংয়ের মাটি অন্যত্র সরিয়ে ফেলা হলেও হয়তো বা কিছুটা কাজ হতো। তার মতে, দেশের নৌপথ রক্ষা করতে হলে অনিয়ম বন্ধের পাশাপাশি নদী ড্রেজিংয়ের দায়িত্ব বিদেশী সংস্থাগুলোকে দেয়া উচিত।

তিনি বলেন, নদীতে পলি বা ডুবোচরের কারণে ঠিকভাবে নৌযান চলাচল করতে পারছে না। ফলে যাত্রীর সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। এতে করে লঞ্চ মালিকরা চরম লোকসানের মধ্যে রয়েছে। এ ব্যাপারে বিআইডব্লিউটিএ ড্রেজিং বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মো: আব্দুল মতিনের বক্তব্য নেয়ার জন্য একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

Back to top button