রাজনীতির সংবাদ

ইউপি নির্বাচনে বাড়ছে সংঘাত, শংকা

স্টাফ রিপোর্টার : প্রধমধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করায় বরিশাল জেলার ৩৬টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা শক্ত অবস্থানে রয়েছেন।

যেকারণে দলের মনোনয়ন পাওয়া নৌকা মার্কার প্রার্থীর সমর্থকদের সাথে একই দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের দিন দিন সহিংসতার ঘটনা বেড়েই চলেছে।

সাধারণ ভোটারদের অব্যাহত হুমকিসহ প্রায় প্রতিদিনই হামলা, পাল্টা হামলার ঘটনা লেগেই রয়েছে। নির্বাচনের দিন নৌকা মার্কার প্রার্থীর সমর্থকরা কেন্দ্র দখল করে রাখবে বলেও সাধারণ ভোটারদের হুশিয়ারী দিচ্ছে। সেদিন একইদলের বিদ্রোহী প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরাও ছেড়ে কথা কইবেন না বলে হুশিয়ারী দিয়েছেন। ফলে নির্বাচনের দিন যতোই ঘনিয়ে আসছে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ততোই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা বেড়ে চলেছে।

জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১১ এপ্রিল প্রথমধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বরিশালের ৫০টি ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরমধ্যে ১৪টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত একক প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র দাখিল করায় তারা বিনাপ্রতিদ্বন্ধীতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের দাবি, দলীয় প্রার্থী মনোনয়নে ভুল সিদ্ধান্ত ও বির্তকিতদের হাতে নৌকা প্রতীক তুলে দেওয়ায় বাকি ৩৬টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দুর্দীনের ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতারা বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্ধীতা করছেন। নির্বাচনের দিন যতোই ঘনিয়ে আসছে বিদ্রোহী প্রার্থীরা নির্বাচনী মাঠে ততোই শক্ত অবস্থান করে নিচ্ছেন। ফলে নৌকা পেলেই চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার মনোভাবের প্রার্থীদের মধ্যে গাত্রদাহ শুরু হয়েছে। যেকারণে দিন দিন সহিংসতার ঘটনা বেড়েই চলছে।

সর্বশেষ নৌকার প্রার্থীর পক্ষে বহিরাগত ভাড়াটিয়া লোকজনে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত উজিরপুর উপজেলার সাতলা ইউনিয়নের ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে গিয়ে এলাকাবাসির হাতে গণধোলাইর শিকার হয়েছে দুইজন বহিরাগত সন্ত্রাসী।

তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে ওই ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও আসন্ন নির্বাচনে আনারস মার্কার স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী খায়রুল বাশার লিটন বলেন, বহিরাগতদের রুখতে ইতোমধ্যে একজোট হয়ে মাঠে নেমেছে পুরো ইউনিয়নবাসী।

সংখ্যালঘু অধ্যুষিত ওই ইউনিয়নের সাধারণ ভোটাররা জানান, ভোটের আগে বহিরাগতদের রুখতে এবং ভোটকেন্দ্র পাহাড়া দিতে তারা লাঠিসোঠা নিয়ে অবস্থান নেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন। তারা আরও বলেন, আগামী ১১ এপ্রিল সাতলা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন অব্যাহত রেখেছে আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী মোঃ শাহিন মাহামুদের সমর্থনে পার্শ্ববর্তী কোটালীপাড়া, আগৈলঝাড়া ও গৌরনদী উপজেলা থেকে আসা ভাড়াটিয়া বহিরাগতরা।

অভিযোগ অস্বীকার করে নৌকার প্রার্থী শাহীন মাহামুদ বলেন, প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থী আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। বহিরাগত লোক সম্পর্কে আমার জানা নেই। উজিরপুর মডেল থানার ওসি মোঃ জিয়াউল আহসান বলেন, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ন নির্বাচনের স্বার্থে কোন বহিরাগতদের নির্বাচনী এলাকায় ঢুকতে দেয়া হবেনা।

একই উপজেলার জল্লা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বেবী রানী হালদারের বিরুদ্ধে সরকারের উন্নয়নের টাকা কাজ না করেই লুটপাটসহ অসংখ্য অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দদের নিয়ে কটুক্তির অডিও রেকর্ড ভাইরাল হওয়ার পরেও পূর্ণরায় তাকে নৌকা প্রতীক দেয়ায় ক্ষিপ্ত হয়েছেন ওই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের বৃহত অংশের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা।

তারা আওয়ামী লীগের দুর্দীনের কান্ডারী সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও স্বতন্ত্র প্রার্থী উর্মিলা বাড়ৈর পক্ষে অবস্থান নিয়ে নির্বাচনী মাঠে কাজ শুরু করেছেন।
অপরদিকে এককালের সর্বহারা অধ্যুষিত বাবুগঞ্জ উপজেলার বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর নগর (আগরপুর) ইউনিয়নে এবারও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে সরদার তারেকুল ইসলাম তারেককে।

অসংখ্য অভিযোগে অভিযুক্ত তারেকের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ওই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটাররা এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী অধ্যাপক কামরুল ইসলাম হিমু’র পক্ষে মাঠে নেমেছেন। ফলে ক্ষিপ্ত হয়ে আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী সরদার তারেকুল ইসলাম তারেকের নির্দেশে তার সমর্থক একসময়ের দুর্ধর্ষ সর্বহারা নেতা শহিদুল খান, কাইউম হাওলাদার, স্বজল হাওলাদার, কালাম খান, রনি ফরাজী, আরিফ হাওলাদারের নেতৃত্বে ২৫/৩০ জনে আগরপুর বন্দরে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থক পলাশ সিকদারের আল-মদিনা ট্রেডার্স নামের মুদী মালের পাইকারী দোকান বন্ধ করে দেয়। খবর পেয়ে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বন্ধ ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান খুলে দিয়ে নৌকার প্রার্থীকে শ্বাসিয়ে গেছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুল ইসলাম হিমু কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি আল-নাহিয়ান খান জয়ের আপন চাচাতো ভাই।

অপরদিকে বাকেরগঞ্জ উপজেলার কলসকাঠী ইউনিয়নের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী ও আওয়ামী লীগ নেতা ওয়াদুদ খন্দকার টিটুর বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী মুন্না তালুকদারের কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে। হামলায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর দুই চাচাতো ভাই গুরুত্বর আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের পর পুলিশ দুইজনকে গ্রেফতার করেছে।

চেয়ারম্যান প্রার্থীদের পাশাপাশি প্রতিদিনই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পরছেন সাধারণ ইউপি সদস্য প্রার্থীদের সমর্থকরা। ইতোমধ্যে গৌরনদীর বাটাজোর ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের সাধারণ ইউপি সদস্য প্রার্থী এবং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ হোসেন বেপারীর সমর্থক বাবুল গাইনকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করেছে প্রতিদ্বন্ধী মেম্বার প্রার্থী ক্ষিতিশ চন্দ্র পালের সমর্থকরা। এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়েরের পর পুলিশ একজনকে গ্রেফতার করেছে।

এছাড়া হিজলা উপজেলার বরজালিয়া ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের মেম্বর প্রার্থী সুলতান তালুকদার (মোরগ) এবং মান্নান ডিলারের (টিউবওয়েল) কর্মীদের মধ্যে হামলা পাল্টা হামলায় উভয়পক্ষের কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়েছে। উজিরপুর উপজেলার শোলক ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের টিউবওয়েল মার্কার মেম্বার প্রার্থী আবু হানিফ বেপারী অভিযোগ করেন, তার প্রতিদ্বন্ধী মোরগ মার্কার প্রার্থী নুরুল হক সরদার ওরফে হাত কাটা নুরু তার সমর্থক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতিসহ হুমকি প্রদর্শন অব্যাহত রেখেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একসময়ের দুর্ধর্ষ সর্বহারা নেতা হাতকাটা নুরুর বিরুদ্ধে এরপূর্বেও দাঙ্গা হাঙ্গামার একাধিক অভিযোগ থাকায় সাধারণ ভোটারদের মাঝে অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে।

সাত ইউনিয়নে ৩১ জন চেয়ারম্যান প্রার্থী : জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়েছেন বানারীপাড়া উপজেলায়। ওই উপজেলার সাত ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত সাতজন প্রার্থীর বাহিরে ১৯ জন নেতা স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিলের পর নিজ এলাকায় শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। পাশাপাশি ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের তিনজন এবং জাসদ ও এনপিপির একজন করে প্রার্থী রয়েছেন। উপজেলা নির্বাচন ও রিটার্নিং অফিসার মোঃ মনিরুজ্জামান জানান, উপজেলার সাত ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে মোট ৩১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্ধীতা করছেন।

নির্বাচনের দিন কেন্দ্র দখল, অস্ত্র দেখিয়ে ভোট আদায় করাসহ অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোঃ জসীম উদ্দীন হায়দার বলেন, নির্বাচনকালীন সময় অবৈধ অস্ত্র ও বৈধ অস্ত্র ব্যবহারের কোন সুযোগ নেই। এছাড়া প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেকোন ধরনের সহিংসতা বন্ধে উপজেলা পর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্তদের কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

জেলা পুলিশ সুপার মোঃ মারুফ হোসেন পিপিএম বলেন, সহিংসতারোধে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। এর ব্যাক্তয় ঘটলে কঠোর আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

Back to top button