প্রধান সংবাদ

দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে পায়রা সেতুর নির্মান কাজ

এম.মিরাজ হোসাইন : দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কের লেবুখালির পায়রা সেতুর কাজ। ২০২১ সালের জুন মাসে এ সেতু চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার বিষয়ে আশাবাদী সড়ক জনপদ ও সেতু বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। চীনের ঠিকাদারী সংস্থা এরইমধ্যে ৬২ শতাংশ নির্মান কাজ সম্পন করেছে। দৃশ্যমান হয়েছে নির্মানাধীন ১১৩২ মিটার সেতু। এই প্রকল্পটি বাংলাদেশের ১০টি মেগা প্রকল্পের একটি।
সূত্রে আরও জানা গেছে, ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে চট্টগ্রামের কর্ণফুলি সেতুর আদলে চার লেন বিশিষ্ট পায়রা সেতুর নির্মান প্রকল্প প্রনয়ন পরবর্তী ২০১৩ সালের ১৯ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১১ শত ২৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা ব্যায়ে এক হাজার ৪৭০ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ১৯ দশমিক ৭৬ মিটার প্রস্তের পায়রা সেতুর নির্মান কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। কুয়েত ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়ন এবং সড়ক যোগাযোগ ও সেতু বিভাগের তত্বাবধায়নে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে সেতু নির্মান কাজ সম্পন্নের কথা ছিলো। কিন্তু বরাদ্দ সংক্রান্ত জটিলতায় পিছিয়ে পরে পায়রা সেতুর নির্মান কাজ। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ২৪ জুন সেতু নির্মান কাজ শুরু করে চীনের প্রকৌশল সংস্থা লং জিয়ান রোড এন্ড ব্রিজ কনস্ট্রাকশন কোম্পানী লিমিটেড। তৃতীয় কর্ণফুলি সেতুর আদলে এক্সটাডোজ কাবল স্টেট পদ্ধতিতে নির্মানাধীন সেতুর ইতোমধ্যে ১১৩২ মিটার অংশ দৃশ্যমান হয়েছে। যদিও পরপর দুই বার সময় বৃদ্ধিকরা হয়েছে এই সেতুর নির্মান কাজের।
সড়ক জনপদ ও সেতু বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ও পায়রা সেতু নির্মান প্রকল্প ম্যানেজার আহমেদ শরীফ সজিব জানান, দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম এবং নান্দনিক এই সেতুটি ৩৫০টি পাইলের উপর ভর করে দাঁড়াবে। এ পাইলগুলো চীন-ভারতসহ বিভিন্ন দেশের প্রকৌশলী ও কারিগর দিয়ে নির্মান করা হয়েছে। তিনি বলেন, সেতুর দুই দিকে এপ্রোচ সড়কের দৈর্ঘ্য হবে এক হাজার ২৬৮ মিটার এবং প্রস্থ ২২ দশমিক ৮০ মিটার। সেতুর মাঝখানে থাকবে এক মিটার দৈর্ঘ্যরে ফুটপাত। মূল সেতুতে স্প্যান থাকবে চারটি। এরমধ্যে মাঝ নদীর দুটি স্প্যান দুইশ’ মিটার ও বাকি দুটি ১৫৫ মিটার করে। প্রতি স্প্যানের দূরত্ব ৬৩০ মিটার। আর নদী থেকে সেতুর উচ্চতা হবে ১৮ দশমিক তিন মিটার।
আহমেদ শরীফ সজিব বলেন, সেতুর বরিশাল প্রান্তে ৩০ মিটার করে ১২টি ও পটুয়াখালী প্রান্তে ১৬টি পিলারসহ মোট ৩১টি পিলার স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। নদীর মধ্যে যে চারটি পিলার হবে তারমধ্যে বরিশাল প্রান্তের পিলার নির্মান শেষ হয়েছে। মাঝখানের পাইলের কাজও প্রায় সম্পন্নের পথে। পটুয়াখালী প্রান্তের পাইল ও পিলারের কাজ শেষের পথে। আগামী ২০২১ সালের জুন মাসের মধ্যে সেতুটি চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হবে।
সড়ক জনপদ ও সেতু বিভাগের পায়রা সেতু প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নূর-ই-আলম বলেন, পাইল ও পিলার স্থাপন কাজ শেষ হয়েছে। এমনকি বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ প্রান্তে ১১৩২ মিটার সেতু এখন দৃশ্যমান। আগামী ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে সেতুর নির্মান কাজ শেষ হবে বলেও আমরা আশাবাদী। তিনি বলেন, পায়রা সেতুর প্রকল্প ব্যয় ১০ শতাংশ বেড়েছে। সেতু রক্ষায় নদী শাসন কাজের জন্য ওই টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় নদীর তীর সংরক্ষণ, ব্লক ও জিও ব্যাগ ফেলানো হবে।
বরিশাল সড়ক, জনপদ ও সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, একটি সময় ছিলো যখন বরিশাল থেকে সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটার যেতে সময় লেগে যেতো পাঁচ থেকে ছয় ঘন্টা। ওইসময় বরিশাল থেকে ১১০ কিলোমিটার সড়কের পাঁচটি পয়েন্টে ছিলো ফেরী। ফলে পথে পথে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে যাত্রী ও পর্যটকদের। ফলে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র সাগর কন্যা কুয়াকাটার দিক থেকে একপ্রকার মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছিলো পর্যটকরা। এরইমধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পর্যটন এলাকা কুয়াকাটাকে ঘিরে এ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে পটুয়াখালীর কলাপাড়া পৌর শহর সংলগ্ন আন্ধারমানিক নদীতে শেখ কামাল, হাজীপুর সোনাতলী নদীতে শেখ জামাল ও শিববাড়িয়া নদীর ওপর শেখ রাসেল সেতু নির্মানের উদ্যোগ গ্রহণ করে দ্রুত তা বাস্তবায়ন করেন। যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সহজ করতে বরিশালের কীর্তনখোলা ও খয়রাবাদ নদীতে নির্মান করা হয় শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের নামে পৃথক দুটি সেতু। ফলে বিগত প্রায় ১০ বছরে দক্ষিণাঞ্চলের সাথে বরিশাল এবং ঢাকাসহ সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক সহজ হয়ে যায়। এরপরেও দুর্ভোগের অন্যতম কারন হয়ে দাঁড়ায় বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলার সীমান্তবর্তী পায়রা নদী।
প্রতিদিন ঢাকা-বরিশালসহ বিভিন্ন রুটের সহ¯্রাধিক যানবাহন ফেরী পারাপারের মাধ্যমে চলতে হচ্ছে। দিন-রাত দুটি করে ফেরী চলাচল করা সত্বেও ২৪ ঘন্টাই যানবাহনের দীর্ঘলাইন পরে যায় নদীর দুই প্রন্তে। যেকারণে লেবুখালী ফেরী দুর্ভোগ নিত্যদিনের সঙ্গীতে পরিনত হয়। এ জনদুর্ভোগ লাঘবে লেবুখালীর পায়রা নদীতেও সেতু নির্মানের উদ্যোগ গ্রহন করে সরকারের সড়ক যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রণালয়।
সূত্রমতে, লেবুখালীর পায়রা নদীতে পায়রা সেতুটি উন্মুক্ত করার পর ঢাকার সাথে গোটা দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার আরও উন্নয়ন হবে। বরিশাল থেকে পটুয়াখালী, বরগুনা ও পর্যটন নগরী সাগর কন্যা কুয়াকাটার সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সহজ হবে। এসব রুটে যোগাযোগ স্থাপনে কমে আসবে সময়। সেতুটি উন্মুক্ত হলে ঢাকা থেকে কক্সবাজারের চেয়ে অর্ধেক সময়ে কুয়াকাটায় যাতায়াত সম্ভব হবে। আর পদ্মা সেতু নির্মানে সময়ের ব্যবধান কমে আসবে আরও কয়েকগুন।
বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কের লেবুখালী পয়েন্টের সর্বশেষ এ সেতুটিকে ঘিরে অর্থনৈতিক ও জীবনমান উন্নয়নের স্বপ্ন দেখছেন স্থানীয়রা। দক্ষিণাঞ্চলবাসীর স্বপ্নের পদ্মা সেতুর পাশাপাশি পায়রা সেতু, পায়রা বন্দর, সমুদ্র বন্দর ও তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে ঘিরে এ অঞ্চলে গড়ে উঠছে বিভিন্ন স্থাপনা। শিল্প উদ্যোক্তারা খুঁজছেন পছন্দের জমি। ফলে জমির মূল্যও কয়েকগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। ###

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

Back to top button