প্রধান সংবাদবরিশাল জেলার সংবাদ

‘বরিশাল কলেজ’ এর নাম বদল প্রচেষ্টার মাজেজা কি?

: এম শামসুদদোহা তালুকদার :
বরিশাল কলেজ। শহরের প্রাণকেন্দ্র কালীবাড়ী রোডে অবস্থিত একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। অর্ধশতাব্দীকালেরও বেশী সময় ধরে এ পর্যন্ত লাখ লাখ ছাত্র-ছাত্রী এখান থেকে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে বের হয়েছে। কখনো করো মনে হয়নি তাদের প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তন করতে হবে।

বরিশাল কলেজের জায়গাটা আসলো কোথা থেকে। হ্যাঁ, এ জায়গাটা এক সময় বরিশালের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব অশ্বিনী কুমার দত্তের বাসভবনের সম্পত্তি ছিল।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় তিনি এটা ফেলে চলে যান কোলকাতায়। পরে আর খবর রাখেননি। ফিরেও আসেননি। তৎকালীন আইনানুযায়ী পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে এটা সরকারের সম্পত্তি হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে ।

১৯৬৩ সালে বরিশাল জেলা প্রশাসন থেকে আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, আব্দুর রহমান বিশ্বাসসহ বরিশালের চারজন প্রাণপুরুষ উপযুক্ত মূল্য দিয়ে স্থায়ীভাবে বন্দোবস্ত নিয়ে শুরু করেন এ প্রতিষ্ঠানটি। প্রথমে ছিল বরিশাল নাইট কলেজ। পরিবর্তীতে ‘বরিশাল কলেজ’ নামকরণ করা হয় ।

এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৬ সালে বরিশাল কলেজ ও হাতেম আলী কলেজ একসাথে সরকারীকরণ করা হয়‌। সংক্ষেপে এটাই ইতিহাস।

বরিশাল কলেজের নাম পরিবর্তন মানছে না বরিশাল কলেজের সাবেক ও বর্তমান ছাত্ররা। এ ব্যাপারে সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু হয়েছে।

বরিশালে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একমাত্র বাসদ ও অশ্বিনী কুমার দত্ত স্মৃতিসংসদ চায় অশ্বিনী কুমার দত্তের নামে নামকরণ করা হোক। এ দাবীতে তারা জেলা প্রশাসক বরাবরে স্মারকলিপি দিয়েছে। জনমত সংগ্রহ করতে তারা বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে যাচ্ছে। এর নেতৃত্বে রয়েছেন, সাহবাগ আন্দোলনের প্রাক্কালে রগ ফুলিয়ে শ্লোগান দেনেওয়ালা, বরিশাল সিটি নির্বাচনে মেয়রপ্রার্থী ডাঃ মনিষা চক্রবর্তী।

অপরদিকে বরিশাল কলেজের নাম অপরিবর্তিত রাখার স্বপক্ষে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ সকল রাজনৈতিক দলই একমত আছে। বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এ ব্যাপারে আপোষহীন নীতি পালন করে যাচ্ছে। আইএবি’র ছাত্র সংগঠন এ আন্দোলনের পুরোধা। ইশা ছাত্র আন্দোলন নিয়মিত মানববন্ধন, প্রতিবাদী মিছিল ও দাবীর স্বপক্ষে গণ স্বাক্ষর কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। বরিশাল কলেজের নাম বরিশাল কলেজই থাকবে।

বরিশালের জেলা প্রশাসক গত ২৯ ফেব্রুয়ারি সরকারি বরিশাল কলেজকে ‘মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত সরকারি কলেজ’ নামকরণের প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন। এরপর ২৯ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরিশাল শিক্ষাবোর্ডকে সরকারি বরিশাল কলেজকে ‘মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত সরকারি কলেজ’ নামকরণের যৌক্তিকতা উল্লেখ করে সুপারিশ পাঠানোর জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করে।

এখন কেন বরিশাল কলেজের নাম চেঞ্জ করার প্রস্তাব উঠবে? আসলে সময়টা বড় অসময়। এ সময়টা ইন্ডিয়ানা যুগের অংশ। সরকার চলছে ইন্ডিয়ার সমর্থন নিয়ে। ভারতের নির্দেশনা বাস্তবায়নকারী হিসেবে সরকার যেন এ ভূখন্ডে বসে আছে। এ সুযোগটা ধরতে চায় বরিশালের কতিপয় বাম-রাম ধারার নেতা-নেত্রীরা। একজন চিকিৎসক কাম রাজনীতিক এ ষড়যন্ত্রের মূলে। সকলের অগোচরে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে নাম বদলের প্রস্তাব পাঠিয়েছে মন্ত্রণালয়ে। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, এর যৌক্তিকতা যাচাইয়ের জন্য বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবরে চিঠি পাঠিয়েছে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুহতারাম আমীর ও নায়েবে আমীরের বাড়ী বরিশালের চরমোনাইতে। মুহতারাম নায়েবে আমীর সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম জাতীয় নির্বাচনে বরিশাল-৫ শহরের আসন থেকে প্রতিদ্বন্ধিতা করে আসছেন।

বরিশাল বাসীর চলমান দাবীর সাথে তিনি একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। শনিবারে তিনি প্রতিবাদের অংশ হিসেবে সরাসরি একটি ‘গোল টেবিল’ আলোচনায় প্রধান অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করবেন। এখানে বরিশালের সর্বস্তরের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশগ্রহন করবেন।

বরিশাল কলেজের নামটাই তো স্বাতন্ত্র্যভাবে বরিশালের ঐতিহ্য ধারণ করে। এ স্বকীয়তা বিনাশ যাতে না হয় সে জন্য প্রতিবাদ জারী রেখেছে বরিশালের আপামর জনসাধারণ। সাবেক ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাবক ও শহরের বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগীসহ সাধারণ জনতা আজ বরিশাল কলেজ নামকরণ পরিবর্তনের বিপক্ষে। তবুও মনে হচ্ছে, সরকার পশ্চিমা বাতাসে দুলছে।

লেখকঃ কলাম লেখক, বিশ্লেষক। সচিব, বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষা বোর্ড, চরমোনাই,বরিশাল।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

Back to top button